মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি সংকট

সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে মরিয়া ইরান

ভেঙে পড়া অবকাঠামো ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতিতে ভুগছে ইরান।

ভেঙে পড়া অবকাঠামো ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতিতে ভুগছে ইরান। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর চেষ্টায় রয়েছে দেশটি। তেহরান আশা করছে, সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে চলমান জ্বালানি সংকট কিছুটা লাঘব হবে। খবর এফটি।

ইরানে রয়েছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশটির সক্ষমতা দিন দিন কমছে। এ কারণে চলতি বছর পুনরায় রোলিং ব্ল্যাকআউট বা পর্যায়ক্রমিক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা চালু করতে বাধ্য হয়েছে ইরান।

তেহরানে অনুষ্ঠিত সৌরশক্তিবিষয়ক সম্মেলনে সম্প্রতি দেশটির উপজ্বালানিমন্ত্রী মোহসেন তর্জতালাব বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকাশ এখন আর শুধু সহায়ক নীতি নয়, বরং এক কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। বিদ্যুৎ নিরাপত্তা অর্জন ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বছরের পর বছর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেয়ায় ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এ খাতে বেশির ভাগ অবকাঠামোই পুরনো। ফলে গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শীতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে ঘন ঘন ব্যাঘাত ঘটছে।

মোট বিদ্যুতের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদন করে ইরান। এখন তারা বিদ্যুতের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান। ইরানের বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে বেশ ব্যয়বহুল। আবার নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন থেকে বিচ্ছিন্ন দেশটি।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানের সংসদ সদস্য নাসরুল্লাহ পেজমানফার অভিযোগ করেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধীরগতি ও অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহই সৌর প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের জন্য দায়ী।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক ইরানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তিন বছরের মধ্যে ১২ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। চলতি বছর এ সক্ষমতা দ্বিগুণ বেড়ে ২ দশমিক ৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এর তুলনায় ২০২৩ সালে তুরস্কে সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিস্যা ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছে, বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবেলায় বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তার সরকার।

ইরানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এটি শিল্প খাতে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি ডেকে আনছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পিক আওয়ারে গ্রিডে ১৫ গিগাওয়াট ঘাটতি ছিল।

বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে সাত গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে গত জুলাইয়ে ২৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। এতে ২০ শতাংশ বিনিয়োগ বেসরকারি খাতে রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ইরানজুড়ে বেশ কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে বছরে প্রায় ৩০০ রৌদ্রোজ্জ্বল দিন থাকে। তাই দেশটি সৌরবিদ্যুতের জন্য অনুকূল অবস্থানে রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের সংগঠন ইরান রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মুসলেম মুসাভি বলেন, ‘আমি নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে, কিন্তু দেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা সীমিত। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’

বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পরিবারগুলোকেও ছাদে সৌরপ্যানেল স্থাপনে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে ইরানে। তবে ইরানে জ্বালানি ব্যবস্থা প্রচুর ভর্তুকিযুক্ত হওয়ায় অপচয়ও হয় বেশি। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘জ্বালানি ব্যবহারে ১০ শতাংশ সাশ্রয়ী হলে প্রতিদিন আট লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ও গ্যাস বাঁচানো সম্ভব।’

সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির জন্য ইরান মূলত চীনের ওপর নির্ভর করে। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিবাদের সূত্র ধরে গত জুনে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। গত মাসে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর ইরানের মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে আমদানি আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

মুসলেম মুসাভি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা অর্থায়ন ও খরচ দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে বিদেশী বিনিয়োগ থেকেও আমাদের বঞ্চিত করছে।’

তিনি আরো জানান, একসময় বিদেশী সংস্থাগুলো ইরানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

আরও